মেক্সিকোর টাবাস্কো প্রদেশের মেয়ে ফাতিমা বশ—যাঁকে আজ গোটা বিশ্ব এক নামে চেনে। কারণ, ২০২৫ সালের মিস ইউনিভার্স হয়েছেন তিনি। অথচ তাঁর ছেলেবেলাই ছিল নানা চ্যালেঞ্জে ভরা। মাত্র ছয় বছর বয়সে এডিএইচডি, ডিসলেক্সিয়া এবং হাইপারঅ্যাকটিভিটির মতো সমস্যার মুখে পড়েছিলেন তিনি। সেসব সময় তাঁকে ভুলভাবে বলা হয়েছিল—‘পড়াশোনায় ভালো না’, ‘মনোযোগ নেই’। কিন্তু সেসব ভুল ধারণা ভেঙে আজ তিনি বিশ্ব মঞ্চে উজ্জ্বল।
ফাতিমার গল্প আমাদের শেখায়—শিশুর ডিসলেক্সিয়া বা এডিএইচডি কোনো অক্ষমতা নয়। সঠিক সময়ে সঠিক সহায়তা পেলে ঝুঁকিগুলোই শক্তিতে পরিণত হয়। দুঃখজনকভাবে, আমাদের সমাজে অনেক শিশুকে ‘মনোযোগ নেই’ বা ‘কিছুই পারে না’—এমন মন্তব্য শুনতে হয়। এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায় এবং নিজের সামর্থ্য নিয়ে আজীবন সন্দেহ থেকে যায়।
ডিসলেক্সিয়া ও এডিএইচডি আসলে কী?
এগুলো অনেক সময় মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের এক ভিন্ন ধরন—যা নিরাময়যোগ্য এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য। অভিভাবক, শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা যদি লক্ষণগুলো দ্রুত চিহ্নিত করেন, তবে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।
ফাতিমা নিজেও বলেছেন,
“যদি আমি ছোটবেলার বুলিংয়ের মুখোমুখি না হতাম, হয়তো নিজেকে বিশ্বাস করতে শিখতাম না।”
আরও বলেন,
“ডিসলেক্সিয়া আর এডিএইচডি কঠিন ছিল, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই একটি বোঝাপড়া আছে, যা তাকে বড় উদ্দেশ্যের দিকে ঠেলে দেয়।”
তাঁর এই উপলব্ধি সেই সব পরিবারের জন্য আশার আলো, যারা আজ সন্তানের শেখার সমস্যা বা মনোযোগহীনতা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তাঁর শিক্ষাজীবনও অনুপ্রেরণাদায়ক—যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা, মেক্সিকোয় ফ্যাশন ডিজাইন, পরে ইতালিতে উচ্চশিক্ষা—সব মিলিয়ে তাঁর পথচলা প্রমাণ করে, সঠিক সুযোগ পেলে যেকোনো চ্যালেঞ্জ জয় করা সম্ভব।
অভিভাবকদের জন্য সতর্কসংকেত
আপনার শিশু যদি—
-
হঠাৎ মনোযোগ হারায়
-
চঞ্চলতার কারণে স্থির হয়ে বসে থাকতে না পারে
-
অক্ষর বা শব্দ চিনতে সমস্যা করে
-
পড়তে গিয়ে দ্রুত বিরক্ত বা হতাশ হয়
-
বানান বারবার ভুল করে
-
নির্দেশনা বুঝতে অসুবিধা হয়
-
কোনো কাজ শুরু করেও শেষ করতে পারে না
তবে বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
কী করবেন?
শিশুর ডিসলেক্সিয়া বা এডিএইচডি সঠিক যত্নে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে এবং তার শেখার সক্ষমতা দ্রুত উন্নত হয়। প্রয়োজন—
১. সঠিক শনাক্তকরণ
স্ক্রিনিং, মূল্যায়ন বা ইউনিট টেস্টের মাধ্যমে সমস্যার প্রকৃতি বোঝা।
২. বিশেষায়িত থেরাপি
মাল্টিসেন্সরি লার্নিং, ফোকাস-বেজড লার্নিং, ধাপে ধাপে শেখানো—যা পড়ার দক্ষতা ও মনোযোগ বাড়াতে কার্যকর।
৩. গোছানো পরিবেশ
রুটিন তৈরি, কাজ ভাগ করে দেওয়া, ছোট বিরতি—এসব শিশুকে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সাহায্য করে।
৪. অভিভাবকের ভূমিকা
প্রশংসা, উৎসাহ এবং সন্তানের প্রচেষ্টাকে মূল্য দেওয়া—শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
৫. স্কুল-বাড়ির সমন্বয়
শিক্ষককে শিশুর সমস্যা জানানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সময় বা সহায়ক পদ্ধতি চাওয়া।
৬. অনুভূতিগত সহায়তা
শিশুকে জানানো—‘তুমি পারবে’, ‘এটা তোমার সীমাবদ্ধতা নয়’—এই বার্তাগুলো তাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে।
শেষ কথা
ফাতিমা বশের সাফল্য শুধু একটি খেতাব জেতার গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দেয়—ভিন্নভাবে কাজ করা মস্তিষ্ক কখনোই কম সক্ষমতা নয়। আমাদের সমাজেও এমন বহু শিশু আছে, যাদের আজ ‘ব্যর্থ’ বলা হয়; অথচ ভবিষ্যতে সঠিক সহায়তা পেলে তারাই পারে দেশের গর্ব হয়ে উঠতে।
চিকিৎসা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং পরিবারের সমর্থন—এই তিনটি মিলেই শিশুর শেখার সমস্যা ও মনোযোগহীনতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আরও পড়ুন: পেটের জ্বালাপোড়ায় এখনই কী করবেন
